Image Not Found!
ঢাকা   ২৬ নভেম্বর ২০২২ | ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

সর্বশেষ সংবাদ

  দেশজুড়ে ওএমএস সুবিধায় সাড়া,স্বল্পমূল্যে চাল-আটা পেয়ে খুশি কার্ডধারীরা (2)        দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি ও বাজার স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যে কাজ করছে সরকার-ময়মনসিংহের বিভাগীয় কমিশনার শফিকুর রেজা বিশ্বাস (94)        সুইস রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য ভুল ছিলো,অন্যরকম জয় পেলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন (3)        তারাকান্দায় বায়তুল আমান জামে মসজিদ ও নূরুল উলুম কওমী মাদ্রাসার কমিটি গঠিত (89)        আগামী মাসে সব স্বাভাবিক হবে-পরিকল্পনামন্ত্রী (2)        শিক্ষক বাতায়নে দেশ সেরা অনলাইন পারফর্মার রেহেনা আক্তার ঝর্ণা (94)        ময়মনসিংহে নারীদের জন্য বিশেষ আয়োজন ‘নিহার লাভলী টাইম উইথ তানজিন তিশা’ (94)        বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নপূরণ করাই আমার লক্ষ্য-প্রধানমন্ত্রী (3)        তারাকান্দায় ভূমিহীনদের জন্য তৈরী প্রধানমন্ত্রীর ২৬ হাজার ২ শত ২৯ টি গৃহের উদ্ভোধনী অনুষ্ঠান পালিত (94)        বিদ্যুৎ ব্যবহারে মিতব্যয়ী হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর (2)      
শতভাগ শিক্ষিত,২০০ বছরে পুলিশ যায়নি,১১ জন বিচারক,একশর বেশী ডাক্তার,দুইশর বেশী প্রকৌশলী,রয়েছে আলাদা গঠনতন্ত্র।

রুপকথার একটি গ্রাম হুলহুলিয়া

ফজলে এলাহি ঢালীঃ

এ যেন এক রূপকথার গ্রাম “হুলহুলিয়া’। যেখানে শিক্ষার হার শতভাগ। নেই একজনও নিরক্ষর। বরং অধিকাংশই উচ্চ শিক্ষায় আলোকিত। এই গ্রামে নেই চুরি, ডাকাতি বা মাদকের ছোবল। ঝগড়া-বিবাদ নেই বললেই চলে। দুঃখে পরস্পরের পাশে দাঁড়ানো আর সুখে আনন্দ ভাগাভাগি করাই তাদের বৈশিষ্ট্য। গ্রামের মানুষকে চমৎকার এই ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে এনেছে “হুলহুলিয়া সামাজিক উন্নয়ন পরিষদ”। এই পরিষদ হুলহুলিয়াকে আধুনিক গ্রাম হিসেবে গড়তে কাজ করে যাচ্ছে। নাটোর জেলার সিংড়া উপজেলার চৌগ্রাম ইউনিয়নে হুলহুলিয় গ্রামটি এ এক আশ্চর্য গ্রাম।

 জেলা সদর থেকে ৩৮ কিলোমিটার এবং সিংড়া থানা সদর থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরে ছায়া ঢাকা, পাখি ডাকা, শান্ত এক গ্রাম হুলহুলিয়া। ১৩টি পাড়া নিয়ে গঠিত চলনবিলবেষ্টিত গ্রামটির আয়তন প্রায় দুই বর্গকিলোমিটার। গ্রামটির শিক্ষার হার ও স্যানিটেশন-ব্যবস্থা প্রায় শতভাগ।

এই হুলহুলিয়া গ্রামের প্রবেশ পথের ৫ গজ পার হলেই হাতের বাম পার্শে দেখা যাবে হুলহুলিয়া সামাজিক উন্নয়ন পরিষদ। নাম উন্নয়ন পরিষদ হলেও গ্রামবাসীর কাছে এটি বিচারের সর্বোচ্চ স্থান। 

 এলাকাবাসীরা জানান, তারা ১৩ টি পাড়া থেকে দুই বছরের জন্য এই পরিষদ ২০ জন সদস্য ও ৫ জন উপদেষ্টা মনোনীত করেন। আর সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সহ চেয়ারম্যান। 

গ্রামটির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, কোনো পাড়ায় কারো কোনো সমস্যা হলে সেই পাড়ার মনোনীত সদস্যরা ওই সমস্যার সমাধান করবেন। সেখানে সমাধান না হলে হুলহুলিয়া সামাজিক উন্নয়ন পরিষদে আবেদন করতে হবে। উন্নয়ন পরিষদে সমস্যার সমাধান না হলে ৩০ দিনের মধ্যে দেশের প্রচলিত আইনের আশ্রয় নিতে হবে। তবে এই গ্রামটির কোনো সদস্যকে এখন পর্যন্ত দেশের প্রচলিত আইনের আশ্রয় নিতে হয়নি।

হুলহুলিয়া সামাজিক উন্নয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আল তৌফিক পরশ বলেন, দুইশ’ বছর আগ থেকে সামাজিকভাবে এই গ্রামের সকল সমস্যার সমাধান চলে আসছে। তবে ১৯৪০ সালে মরহুম জালাল উদ্দিন মৃধাকে প্রথম চেয়ারম্যান করে হুলহুলিয়া সামাজিক উন্নয়ন পরিষদের কার্যক্রম শুরু হয়। আর এই সময় থেকে তাদের গঠনতন্ত্র দিয়ে চলছে এই গ্রাম। 

 

তিনি বলেন, শতভাগ শিক্ষিত গ্রামটির অধিকাংশ মানুষ উচ্চ শিক্ষিত। গ্রামটির ১শ’ জনের অধিক ডাক্তার, ২শ’ জনের অধিক ইঞ্জিনিয়ার, ১১ জন বিচারকসহ বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উচ্চ পর্যায়ে কর্মরত রয়েছেন। গ্রামটিতে ২৫ বছর ধরে সর্বনিম্ন লেখাপড়া জানা মানুষটিকেও কমপক্ষে এসএসসি পাস করতে হবে। 

আল তৌফিক পরশ জানান, গ্রামটির কারো লেখাপড়ার খরচ বহন করার সামর্থ্য না থাকলে তাদের পরিষদ থেকে তা বহন করা হয়। 

 

চৌগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাহেদুল আলম ভোলা জানান, এছাড়া গ্রামটির কর্মক্ষম কোনো ব্যক্তি বেকার থাকেন না। ১টি উচ্চ বিদ্যালয়, প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসার পাশাপাশি ২০১৬ সালে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে স্থাপন করা আইসিটি ট্রেনিং সেন্টার। আইসিটি ট্রেনিং সেন্টারে ৫ বছর ৬৫০ জন শিক্ষার্থীকে অনলাইনে আয়ের প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মক্ষম করা হয়েছে। 

তিনি বলেন, হুলহুলিয়া সামাজিক উন্নয়ন পরিষদের দ্বিতীয় তলায় রয়েছেন কমিউনিটি সেন্টার ও রেস্ট হাউজ। অন্য গ্রামের বাসিন্দারা এগুলো ব্যবহার করলে ভাড়া নেওয়া হলেও এই গ্রামের বাসিন্দারা বিনামূল্যে ব্যবহার করতে পারেন। 

পল্লী দারিদ্র বিমোচন ফাউন্ডেশন এর যুগ্ম পরিচালক ও হুলহুলিয়া শেকড় এর প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ড. মো: মনারুল ইসলাম মনাক্কা বলেন, গ্রামে ২০০০ সাল থেকে হুলহুলিয়া শেকড় নামের সামাজিক সংগঠন বেকারদের কর্মসংস্থান নিয়ে কাজ শুরু করে। বর্তমানে এর সদস্য সংখ্যা ২৬৫ জন। ইতিমধ্যে হুলহুলিয়া গ্রামকে বেকার মুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে।

 

নাটোরের পুলিশ সুপার  বলেন, গ্রামটির বাসিন্দারা একটি বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। আর উচ্চ শিক্ষার কারণে এখানে সবাই সচেতন। এতে এখানে বড় ধরনের অপরাধ ঘটেনা। ছোট-ছোট অপরাধ ঘটলেও গ্রামবাসী একই বন্ধনে থাকায় তারা তা সমাধান করে নেন দ্রুত।

সিংড়া থানার পরিসংখ্যানই বলে, হুলহুলিয়া গ্রামের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুবই ভালো। জমি জমা নিয়ে বিরোধ হলেও গ্রামের পরিষদই তা সমাধান করে।

সিংড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, 'হুলহুলিয়া গ্রাম দেশের আর দশটা গ্রাম থেকে অনেকটা আলাদা। এই গ্রামের মানুষ সামাজিক বন্ধনকে বেশি গুরুত্ব দেয়। এমন আদর্শ গ্রাম যেন প্রতিটা জায়গায় হয়।

 

 

নাটোরের জেলা প্রশাসক  বলেন, গ্রামটি হাজার বাসিন্দার মধ্যে হাজার জনই উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দেশে-বিদেশে বিভিন্ন সংস্থায় উচ্চ পদে কর্মরত রয়েছেন। ২শবছর ধরে গ্রামবাসী তারা সামাজিক বন্ধনে আবদ্ধ রয়েছেন। গ্রামের সদস্যদের অপরাধ না করার প্রবণতা সারা দেশের মডেল এটি। আর গ্রাম থেকে শিক্ষা নিয়ে সারা বাংলাদেশের গ্রামগুলোও এমন হওয়ার প্রত্যাশা করেন তিনি।

 

দৈনিক আজকের ময়মনসিংহ।